রবিবার, ৩ মে, ২০২০

নিতাইয়ের রেডিও

রেডিওটা নিতাইয়ের নয়। নিতাইয়ের টিভি, রেডিও, ফ্রিজ, গ্যাসের উনুন এসব কিচ্ছুটি নেই। এসব রাখার মত সামর্থ্য বা ইচ্ছে কোনোটাই তার নেই। নিতাই নিতান্তই ঝাড়া হাত পা মানুষ। পৈতৃক একটা বাস্তুভিটে আছে বটে, কিন্তু সে ভিটেও মোটেই বড় সড় বাড়ি নয়। টালির চালা খুপরি। একটা ঘর আর রান্নাঘর সে ভাড়া দিয়েছে। বাথরুম কমন। ভাড়াটেরা টাকা পয়সা দিতে পারেনা বটে, কিন্তু নিতাইয়ের দুবেলার খাওয়াটা ওখান থেকেই আসে, আর মাস গেলে ইলেকট্রিকের বিল ভাড়াটেরাই দিয়ে দেয়। এই ব্যবস্থাতেই ঘর ভাড়া দেওয়া। 

তা নিতাইয়ের খরচাপাতি সামান্যই। সে সিগারেট বিড়ি খায়না। নিয়মিত চায়ের অভ্যেসও তার নেই।  জামা কাপড়, সিনেমা, বই, খেলা কোনো কিছুতেই নিতাইয়ের উৎসাহ নেই। সে ভারি সাদামাটা লোক। আর শখ আহ্লাদ নেই বলেই, খরচও নেই। নিতাইয়ের বাবার ছিল রেডিও সারানোর ছোট্ট দোকান। সে দোকান বহুকাল হলো বন্ধ। দোকানটা বাড়ির যে দিকে ছিলো সেদিকে এখন নিতাই থাকে। দোকানের ঝাঁপ পাকাপাকি ভাবে বন্ধ বহু বছর। শুধু গলির দিকে বাইরের দেওয়ালে লাগানো রঙ চটা সাইনবোর্ডটা রয়ে গেছে। রেডিও সারানোর দোকান হলেও তাতে পাখা, ছোটোখাটো ইলেকট্রিক মোটর, মিস্তিরিদের ইলেকট্রিকে চলা ড্রিল মেশিন, পরের দিকে ঘরোয়া মিক্সি বা টিউবলাইট ফিট করানো বা সুইচবোর্ড মেরামত করার ফরমায়েসও আসতো। নিতাইও টুকটাক শিখে নিয়েছিলো সে সব কাজ। কিন্তু বাপের মত দোকান চালানোর ইচ্ছেটাই তার ছিলো না। ধরাবাঁধা কাজ, খাটুনি এসব থেকে নিতাই চিরকাল শতহস্ত দূরে। সে দুবেলা অল্প স্বল্প ডাল ভাত আর রাতে শোবার জন্যে একটা বিছানা পেলেই খুশী। তার ঘরের ছাত থেকে একটা বহু পুরোনো পাখা ঝোলে। সেটা বোধহয় ব্রিটিশ আমলের। কেউ সারাতে দিয়ে গিয়েছিলো, আর নেয়নি। সেই থেকে পাখাটা এখানেই থেকে গেছে। সে পাখাও নিতাই রোজ চালায় না।বরং তার তক্তপোশের পাশের জানলাটার পরেই মিত্তিরদের পুকুর। তার চারদিকেই বড় বড় গাছ। আর সেই গাছের ছাওয়াতে বেশ ঠান্ডাই থাকে তার বাড়ি। 

কখনো সখনো নিতাইয়ের ডাক আসে এলাকার কোন বাড়ি থেকে। পুরোনো পাখা চলছেনা, পুরোনো মোটর খারাপ হয়েছে, কিম্বা নতুন সুইচবোর্ড লাগাতে হবে এই সব কারনে। দু পাঁচ টাকা যা আসে মাঝে মাঝে তা এই থেকেই। নিতাইয়ের রোজগারপাতি ভালো হলে সে মাঝে মাঝে রোববার করে পাড়ার মোড়ের ষষ্টির তেলেভাজা কিনে খায়। ষষ্টির হাতযশ আছে। রোববার সে দোকানের সামনে দাঁড়ালে কমপক্ষে আধঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়। তা নিতাইয়ের তাড়ার কিছু থাকেনা কোনো কালেই। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখে তেলেভাজা হচ্ছে কি সুন্দর। আলুর চপ, বেগুনি কেমন ফুলে ফুলে উঠছে। আর দেখে লোকের উর্ধ্বশ্বাসে দৌড় আর তাড়া। রোববার ছুটির দিন, কিন্তু তাও কত তাড়া সকলের। যদি কখনো বেশ দাঁও মারার মত আয় হয়, মানে শ খানেক টাকার মত বা তারও বেশী, সেই দিন নিতাই যায় মা কালী মিষ্টান্ন ভান্ডারে। এলাকার সব চেয়ে বড় মিষ্টির দোকান। এখানে বহু রকম মিষ্টি পাওয়া যায়। নিতাই তার কোনোটারই প্রায় নাম জানেনা। কিন্তু এটা জানে, সন্ধ্যের মুখটায় মা কালীতে গরম রসগোল্লার কড়া নামে। সেই গরম রসগোল্লা খান চারেক কিনে দোকানে বসেই খেয়ে নেয় নিতাই। এইটে হলো তার বড়মানুষীর চুড়ান্ত। তা সেদিনও নিতাই গরম রসগোল্লাই খাচ্ছিলো, এমন সময় লোকটা তাকে ধরলো। মোটাসোটা মাঝবয়সী কারবারি লোক। ঝুঁপো গোঁফ আছে, চোখে চশমা আর বাঁ গালে একটা কালো জড়ুল। লোকটাকে সে কস্মিনকালেও দেখেনি। কিন্তু লোকটা তাকে চেনে। কেননা “আরে নিতাই যে, তোমাকেই খুঁজছিলুম” বলে এগিয়ে এলো। তার কুশলসংবাদ নেবার পর সময় নষ্ট না করে সোজা কাজের কথায় চলে গেল লোকটা। নাম একটা বলেছিলো বটে, কিন্তু সেইটে একদম মনে নেই নিতাইয়ের। কদিন পরেই পূজো, আর সামনে মহালয়া। বছরের এই সময়টায় লোকজন মহালয়া শোনার জন্যে ঝেড়েঝুড়ে পুরোনো রেডিও বের করে, তাতে ব্যাটারি পরায়। এ লোকটার রেডিও নাকি নতুন ব্যাটারি পেটে নিয়েও সাড়াশব্দ দিচ্ছেনা। এদিকে …

পরের দিন একটু বেলার দিকে রেডিওটা আর আগাম পঞ্চাশ টাকা দিয়ে গেছিলো লোকটা। বলেছিলো দুদিন পরে এসে নিয়ে যাবে। কিন্তু কে জানে কেন আর আসেনি। সেই থেকে রেডিওটা রয়েই গেছে নিতাইয়ের ঘরে। তক্তপোশের মাথার দিকে একটা বড় পুরোনো টেবিল আছে। ওটার ওপরেই নিতাইয়ের বাবা এবং নিতাই দুজনেই সারাইয়ের কাজ করে এসেছে। হাজার রকম ভাঙাচোরা জিনিসপত্রের ডাঁই ওই টেবিলের ওপর। তার ওপরে ধুলোর পুরু আস্তরন। রেডিওটা ওর মধ্যেই ছিলো, কিন্তু মুশকিল পাকালো বল্টু। নিতাইয়ের সঙ্গীসাথী নেই কেউ বটে, এই এক বল্টু ছাড়া। বল্টু কোন মানুষ নয়, সে হলো একখানি কেঁদো চেহারার গম্ভীর প্রকৃতির হুলো। নিতাইয়ের সঙ্গে তার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। সকাল বেলা নিতাই যখন বাইরে টুল পেতে বসে বসে গলির লোকজন দেখে, ছোঁড়াদের ক্রিকেট ম্যাচ দেখে, তক্তপোশ তখন বল্টুর দখলে। দুপুরে নিতাইয়ের পাতে একটু ভাত খেয়ে বল্টু বেড়াতে বেরোয়। ফেরে আবার সেই সন্ধ্যে ঢলিয়ে। রাতে আবার দুটি খায়, তার পর সে শিকারী নিশাচর হয়ে বেরিয়ে পড়ে। কথাবার্তা বড় একটা হয়না, কিন্তু দুজনেই দুজনকে সঙ্গ দেয় এটা ঠিক। সেদিন মাঝরাতে হঠাৎ ঘুমটা ভাঙলো নিতাইয়ের কিছু একটা শব্দে। ঘুম ভাঙার পর মাথাটা এমনিতেই ভোম্বল হয়ে থাকে, তাই নিতাই খেয়াল করতে পারলো না কিসের শব্দ। অন্ধকারে চোখটা একটু সইতেই দেখতে পেলো মেঝের ওপর পড়ে আছে সেই পুরোনো রেডিও, ব্যাটারি গুলো গড়িয়ে চলে গেছে ঘরের কোনে। আর বল্টূ টেবিলের ওপর থেকে লাফ দিয়ে নামছে কিছু একটা তাড়া করে। হয়ত ইঁদুরই হবে। কিন্তু এ ঘরে ইঁদুরের উৎপাত তো ছিলোনা কোন কালে! নিতাই পাশ ফিরে শুয়ে আবার ঘুমোতে চেষ্টা করল। 

মুশকিল হলো বয়স বাড়ছে। এমনিতে হিসেব থাকেনা যদিও, তবে আন্দাজ আর বছর চারেক পর তিন কুড়ি বয়স হবে নিতাইয়ের। ঘুম একবার ভাঙলে আর চট করে আসতে চায় না আজকাল। কিছুক্ষন এপাশ ওপাশ করে উঠেই পড়ল নিতাই। বড্ড গরম লাগছে। ভাবলো পাখাটা চালাবে নাকি। পাখাটায় বড় বিদঘুটে ঘটাং ঘটাং আওয়াজ হয় মাঝে মাঝে। এখন মাঝরাতে চালালে ভাড়াটের মুখরা বৌ নির্ঘাত চেঁচামেচি শুরু করবে। মাঝরাতে এসব ভালো লাগে না। কিছুক্ষন বসে থেকে আলটাই জ্বাললো নিতাই। জানলাটাও অল্প ফাঁক করল, যদি বাইরে হাওয়া একটু আসে। আগে কুঁজোয় জল থাকতো। এখন সে সব পাট বেশীরভাগ বাড়িতে উঠে গেলেও নিতাইয়ের একখানা বহু পুরোনো কুঁজো আছে। সেটা থেকেই জল গড়িয়ে খেলো। তার পর রেডিওটা তুলে টেবিলের ওপর রেখে ব্যাটারিগুলো কুড়িয়ে আনলো। চারখানা বড় সাইজের ব্যাটারি লাগে। মনে পড়ছে এবার, রেডিওটা দেখে নিতাই মোটেও বুঝতে পারেনি কি হয়েছে এটার। খুলে ভেতরে দেখার সময় স্রেফ স্পিকার ছাড়া আর কিছুই বোধগুম্য হয়নি তার। বিশেষ করে নব ঘুরিয়ে ব্যান্ড ধরার জায়গাইয় যা লাগানো আছে, তা কখনো সে চোখেই দেখেনি। এমনকি নবের ওপরে ব্যান্ডের জায়গাতেও অত্যন্ত ছোট ছোট অক্ষরে চার সারি সংখ্যা লেখা, আর ব্যান্ডের নব একটার জায়গায় চারটে। সব চেয়ে নিচেরটা পরিচিত ব্যান্ডের সংখ্যা সেটা দেখাই যাচ্ছে। কিন্তু ওপরের তিনটে? এ ছাড়া চতুর্থ বড় নব রয়েছে। কিন্তু রেডিওটার কোথাও কোনো কোম্পানির চিহ্ন বা নাম ধাম কিছু নেই। নিতাই অনেক রেডিও ঘেঁটেছে। ওজন আর তার দেখেই বুঝতে পারে এ জিনিস সস্তার কোনো সেট নয়। খুব দামি কোনো কিছু একটা। তাই সেবারে বেশী নাড়াঘাঁটা করতেও সাহস পায়নি। বরং ঠিক করেছিলো, সেই লোকটা এলে রেডিওটা ফেরত দিয়ে দেবে, আর সেই পঞ্চাশটাকার নোটও। সে টাকা ব্যাটারির বাক্সতেই গুঁজে রেখেছিলো নিতাই। এদিক ওদিক দেখে সে টাকা নিতাই পেয়েও গেল। ছিটকে গিয়ে তক্তপোশের একটা পায়ার সামনে পড়েছিলো। 

 ব্যাটারি গুলো ভরে, পেছনের খাপটা আটকাতেই রেডিওটার ভেতরে কিছু একটা ঘটল, যেটা নিতাই রেডিওটা হাতে ধরে আছে বলে বুঝতে পারলো। খুব মৃদু একটা কম্পন টের পাওয়া যাচ্ছে রেডিওটার ভেতরে। সামনে ফিরিয়ে রেডিওটা টেবিলের ওপরে বসাতে বুঝতে পারলো ব্যান্ডের প্যানেলটায় মৃদু একটা আলো জ্বলছে কাচের ভেতরে। নিতাই উঠে গিয়ে ঘরের আলোটা নেভালো। এত রাতে কেউ বাইরে থেকে দেখলে কিছু ভেবে বসতে পারে। তার ওপরে রেডিওটা দেখে মনে হচ্ছে এর বেশ দাম হবে। চোখের একটা সমস্যা অনেকদিন থেকেই হচ্ছিলো বলে মাঝে মোড়ের মাথায় চশমার দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল নিতাই। তা সেখানে ছেলেটি পাড়ার ছেলে হবার সুবাদে কি সব যন্ত্র দিয়ে চোখের ভেতর দেখে টেখে পাওয়ার বের করে একটা পুরোনো চশমার ফ্রেমে দু খানা কাচ আটকে দিয়েছিলো। খরচ পড়েছিলো ৬০০ টাকা। সেটাও নিতাইয়ের কাছে অনেক। তবে চশমা পরে অনেক কিছুই ভালো দেখতে পাচ্ছিলো, বিশেষ করে ছোটো অক্ষর। খাটের পাশে তাক থেকে চশমার বাক্স নামিয়ে চশমাটা বের করে চোখে পরল নিতাই। এবার দেখলো শব্দ বাড়ানো কমানো বলে যেটা ভাবছিলো, তার তলায় খুদে খুদে  অক্ষরে লেখা “Ein / Aus”। নিতাই ইংরিজি জানেনা, তবে গুড মর্নিং গুড নাইট গোছের দু একটা শব্দ চিনতে পারে। আর রেডিওর ওপরে মোটামুটি যা লেখা থাকে, সে গুলো ভালো করেই জানে।  ছোট নব গুলোর ওপরে লেখা আছে যথাক্রমে “Jahr”, “Monat” এবং “Tag”। এসব শক্ত ইংরিজি কিছুই বুঝলোনা নিতাই। তবে চতুর্থ নবের তলার পরিস্কার লেখা “Band”, সেটা দেখে এবং ওপরে ব্যান্ডের সারিতে পরিচিত সংখ্যা এবং কিলোহার্টজ লেখা আছে দেখে বুঝলো এটা একদম নির্দিষ্টভাবে ব্যান্ডই। আর ব্যান্ডের সারির নিচে লেখা আছে “MW/KW”, নিতাই আন্দাজে বুঝে নিলো, এটা মিডিয়াম ওয়েভ আর শর্ট ওয়েভ ট্রান্সমিশনের জন্যে লেখা, যদিও SW র জায়গায় লেখা KW। ব্যান্ডের পটিতে দুই রকম ফ্রিকোয়েন্সিই লেখা আছে। কিন্তু শর্ট ওয়েভ আর মিডিয়াম ওয়েভের সুইচটা খুঁজে পেলো না। 

কিছুক্ষন নাড়াচাড়া করে বড় নবটা ঘোরাতেই খট করে একটা শব্দ হলো, আর ব্যান্ডের জায়গায় যে মৃদু আলোটা জ্বলছিলো, সেটা নিভে গেল। নিতাই বুঝলো, রেডিওটা বন্ধ হলো। ও হরি, এ তার মানে উলটো দিকে ঘোরালে বন্ধ হয়। এবার নিতাই সাধারন রেডিও যে দিকে বন্ধ করার জন্যে ঘোরায় সেদিকে ঘোরালো নবটা। আবার খুট করে শব্দ করে ব্যান্ডের জায়গায় আলোটা জ্বলে উঠলো। আর একটু ঘোরাতেই মৃদু ঘষঘষ আওয়াজ পেলো। ঠিক মত রেডিও স্টেশন না ধরা থাকলে যেমন আওয়াজ বেরোয়ে, ঠিক সেরকম। নিতাই কলকাতা ক এর জায়গায় নিয়ে এলো কাঁটা ঘুরিয়ে। সেই একই ঘসঘস শব্দ ছাড়া কিছু বেরোলো না। নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আরো অন্য স্টেশন ধরতে চেষ্টা করলো নিতাই। অবশেষে অস্পষ্ট কথা ভেসে আসতে লাগল কোনো অজানা স্টেশন থেকে। বিদেশি ভাষা। অল্পক্ষন শুনলো। তার পর কি মনে করে নিতাই রেডিওটা বন্ধ করে দিয়ে, খাটে শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল। মনে বেশ চিন্তা এসে ঢুকেছে। রেডিওটা সাধারন নয় মোটেই, রীতিমত দামি কিছু একটা। আর এ রেডিও এতদিন অযত্নে টেবিলের ওপরে পড়ে আছে। যে কেউ তুলে নিয়ে যেতে পারে। এ ঘরে তেমন ষন্ডামার্কা কেউ ঢুকলে নিতাই খড়কুটোর মতই উড়ে যাবে তার সামনে। চিন্তায় বিন বিন করে ঘাম বেরিয়ে গেল। আর ঠিক তক্ষুনি ওপাশের আমগাছ থেকে একটা কাক কর্কশ গলায় ডাকতে শুরু করল। ভোর হয়ে আসছে।   

রাতে অনেক্ষন জেগে থাকার কারনে কিনা কে জানে, ঘুম ভাঙলো অনেক দেরি করে। চোখে মুখে জল দিয়ে, ডাবরের লাল দন্তমঞ্জন দিয়ে দাঁত মেজে নিতাই বেরিয়েই পড়ল। সাধারনত বেরোয়া না বাড়ি থেকে বলে সে পুরোনো লুঙ্গি আর গেঞ্জিতেই চালিয়ে নেয়। কিন্তু আজ ঝেড়ে ঝুড়ে বের করা প্যান্ট আর একটা চেক চেক শার্টে তাকে অন্য রকম দেখাচ্ছে। পকেটে একটা ছোট চিরকুটে ভাড়াটের ছেলের কাছ থেকে কলম চেয়ে রেডিওর গায়ে লেখা অজানা ইংরিজি গুলো টুকে নিয়েছে নিতাই। পাড়া পেরিয়ে, চৌমাথার মোড় পেরিয়ে উকিলপাড়া, স্টেশন বাজার হয়ে রেললাইন টপকে নিতাই এসে পোঁছলো রতনবাবু স্যারের বাড়ি। রতনবাবু স্যারের বয়স হয়েছে। আশীর ওপর তো বটেই। কিন্তু হরনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ের হেডমাস্টার হবার কারনে অবসরের পরেও মেজাজটি ষোলো আনা বজায় আছে। লোহার গ্রিলের গেট ঠেলে ঢুকতে ঢুকতে রতনের একটু পেট গুড় গুড় করছিলো। বহুকাল আগে রতন স্যারের কাছে স্কুলে ইংরিজি পড়েছে। জানার মধ্যে সেরা ইংরিজিতে জ্ঞান এক এই রতনবাবু স্যারেরই হতে পারে, তাই ওনার কাছে আসা। স্যার বারান্দায় বসে কাগজ পড়ছিলেন। চোখে মোটা কাচের চশমা। এতকাল পরে দেখে চিনতে না পারাই স্বাভাবিক। কতই তো ছাত্র বেরিয়েছে স্যারের হাত দিয়ে। বাজখাঁই গলায় “কে!!” শুনেই নিতাইয়ের একবার মনে হয়েছিলো পালিয়ে যায়, কিন্তু মনের ভেতরকার বেয়াড়া কৌতুহল তাকে ভেতরে ঠেলে নিয়ে গেল। নিজের পরিচয় দেওয়ার পর মনে হলো না স্যার তাকে চিনতে পারলেন বলে। কিন্তু দরকারের কথাটায় চলে গিয়ে চিরকুটটা বার করতেই স্যার কিছুটা উৎসুক হয়ে উঠলেন। আজকাল এরকম আবদার নিয়ে কেউ খুব একটা আসেনা। ফোনেই কি সব করে খোঁজা টোঁজা যায়। শব্দগুলো খুঁটিয়ে পড়ে ইংরেজির ঝানু মাস্টার রতন বাঁড়ুজ্যে যা বুঝলেন, তা হলো, কোন মতেই এগুলো ইংরেজি শব্দ নয়। তবে মনে হচ্ছে পশ্চিম ইয়োরোপেরই কোন অঞ্চলের ভাষা। একটা সন্দেহ হলো তাঁর মনে। হাঁক দিয়ে নাতনিকে ডাকলেন। সে এবারে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার্থী, ইন্টারনেটে খুবই সড়গড়। নাতনি আসার ফাঁকে আর একবার নবাগত লোকটিকে ভাল করে দেখলেন রতনবাবু স্যার। রেডিওর মিস্ত্রি! রেডিওর গায়ে এসব লেখা? নির্ঘাত দামি রেডিও, এবং বিদেশী। 

রতনবাবু স্যারের নাতনি উজ্জ্বয়িনি শব্দগুলো হাতের ফোনে ইন্টারনেটে খুঁজে বের করে তাদের উৎপত্তি ও অর্থ বলতে ঠিক দু মিনিট সময় নিলো। খুবই সাধারন শব্দ, এবং ভাষাটা জার্মান। “Ein / Aus” হলো “Einschalten / Ausschalten” অর্থাৎ অন / অফ করা।   “Jahr”, “Monat” এবং “Tag” এর অর্থ বছর, মাস এবং দিন। রতন বাবু মোটা চশমাটা আঙুল দিয়ে ঠেলে তুলে ভালো করে দেখলেন নিতাইকে। রেডিওতে এই সব লেখা আছে? মনে করতে পারলেন না তাঁর দেখা কোন রেডিওয়ে সাল তারিখ দেখেছেন এর আগে। তবে জার্মান মেড জিনিস , হতেই পারে। কলকব্জায় ওরাই সেরা। কিন্তু লোকটার অন্য কোন মতলব নেই তো? মলিন পরিচ্ছদ, খর্বকায় এবং অপুষ্টিতে ভোগা শরীর। নিম্নবিত্ত জীবনের লড়াইতে পেছিয়ে পড়া হেরে যাওয়া চেহারা। নাঃ, মনে তো হয় না তেমন মতলববাজ লোক। বলছে প্রাক্তন ছাত্র ছিলো। হতেও পারে। কতজনই তো এলো গেল। যারা একটু নাম টাম করেছে, তাদের নামগুলো তবু মনে থাকে। আজকাল তো কেউই খোঁজ খবর নেয় না তেমন। কাজেই…। রাস্তায় নেমে খেয়াল হল “MW/KW” র মানেটা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি।

টেবিলের ওপরে খুঁজে পেতে শক্ত কার্ডবোর্ডের বাক্স থেকে একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস পাওয়া গেল। সেটা দিয়ে নিতাই বছর, মাস আর দিনের লেখা গুলো পড়তে চেষ্টা করল। বছরের শুরু ১৯২৩ থেকে এবং শেষ ২১১০ সালে। মাসের হিসেব সোজা, ১ থেকে ১২। আর দিন ১ থেকে ৩১। নব ঘুরিয়ে গুরিয়ে বছর, মাস আর দিনের কাঁটাকে ইচ্ছে মত সরানো যায়। পরীক্ষা করার জন্যে নিতাই নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বছর মাস আর দিনের কাঁটা গুলো আজকের দিনে নিয়ে এলো। সব কটা কাঁটাই ঠিক ঠাক কাজ করছে। টুলে বসে দেখতে অসুবিধে হচ্ছিলো বলে রেডিওটা ভালো করে ঘুরিয়ে তক্তপোষের দিকে বসাতে গিয়ে রেডিওর বাঁ পাশে হাতে ঠেকলো একটা ছোট্ট সুইচ। সেটার এক দিকে লেখা MW অন্য দিকে KW। অর্থাৎ এই সুইচ দিয়ে শর্ট ওয়েভ আর মিডিয়াম ওয়েভের ব্যান্ড পরিবর্তন করা যাবে। দূর দেশের রেডিও স্টেশন শুনতে শর্ট ওয়েভ ভরসা। মিডিয়াম ওয়েভ ভাল স্বল্প দুরত্বের জন্যে। এবার রেডিওটা অন করল। মিডিয়াম ওয়েভে কলকাতা ক ধরার চেষ্টা করল। বাংলা ভাষায় পরিস্কার কথা শোনা যাচ্ছে। একটা কোন প্রশ্নোত্তরের আসর চলছে। নিতাই কেমন উত্তেজনা বোধ করল। এত বছর রেডিও নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন রেডিওর শব্দ শুনে এরকম রোমাঞ্চ জাগেনি তার। কলকব্জার বেশীরভাগটাই তার কাছে অজানা। এমনকি পরিচালনপদ্ধতিও। হয়ত সেই কারনেই। চান করতে যাবার আগে নিতাই মোড়ের মাথার দোকান থেকে গোটা আষ্টেক ব্যাটারি কিনে নিয়ে এলো। বলা যায় না, এত জটিল যন্ত্রপাতি, হয়ত খুব বেশী ব্যাটারি খায়। তাই কিছু ব্যাটারি নিজের কাছে রেখে দেওয়াই ভালো। খেতে বসে আনমনে ফেলে ছড়িয়ে খেয়ে উঠে পড়ল নিতাই। বল্টু আজ গুরুভোজনের পর আবার তক্তপোশে উঠে চার পা ছড়িয়ে ঘুম দিলো। 

নিতাই বুঝে উঠতে চেষ্টা করল সাল তারিখ গুলোর অর্থ কি। কি মনে হওয়াতে দিনের কাঁটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলো, কলকাতা ক তেই অনেক রকম অনুষ্ঠান হচ্ছে দিন বদলালে। আরো কিছুক্ষন ভাবার পর একটা নিতান্ত অবাস্তব সম্ভাবনা এলো নিতাইয়ের মাথায়। এ ও কি হতে পারে? এ কি সম্ভব? কিন্তু যদি সত্যি তাই হয়, তা জানার উপায় হলো…। নিতাই ঘড়ি ব্যবহার করে না। রাস্তার উলটো দিকে গদাধর সরকারের বাড়ির জানলা দিয়ে দেওয়ালে টাঙানো বাহারি ঘড়ি দেখা যায়। নিতাই সেই ঘড়িটা দেখতে চেষ্টা করল বাইরে বেরিয়ে। ভর্তি দুপুর বলে দরজা জানলা সব বন্ধ। তার ওপরে এই ভরদুপুরে গেরস্থের বাড়ির জানলা দিয়ে উঁকি মারলে এবং কেউ দেখে ফেললে অনর্থ ঘটার সম্ভাবনা ষোলো আনার ওপর আঠেরো আনা। কাজেই অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। নিতাই যদিও রেডিও শোনেনা বহু কাল, কিন্তু মোটের ওপর দেখেছে সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা নাগাদ অনেক গুলো খবর হয় বা আগে হতো। বাংলা সংবাদ, দিল্লি থেকে, তার পরে স্থানীয় সংবাদ। গদাই বাবুর জানলা দিয়ে ঘড়িতে সাড়ে সাতটা বাজার ঠিক মিনিট বাকি দেখে নিতাই একটা লাফ মেরে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলো। কয়েক মুহুর্ত রেডিওর দিকে তাকিয়ে থেকে রেডিও অন করল নিতাই। পরের কিছু মিনিট নিতাইয়ের এযাবৎকালের পরিচিত পৃথিবীকে একদম উলটে পালটে দিয়ে গেল। শব্দ কিছুটা করকরে এবং অস্পষ্ট হলেও বুঝতে কোনোই অসুবিধে হয় না, যে থর থর উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে সংবাদ পাঠক ঘোষনা করছেন এই দেশ , এই ভারতবর্ষ অবশেষে বৃটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন। লাল কেল্লা শীর্ষে পতপত করে উড়ছে তেরঙা জাতীয় পতাকা। সেই মুহুর্তে  নিতাইয়ের রেডিওর সাল ১৯৪৭ মাস ০৮ অর্থাৎ আগস্ট এবং দিন ১৫ই। কোন এক অদ্ভুত বিজ্ঞানের বলে বলিয়ান এই রেডিও সময়ের বেড়া ডিঙ্গিয়ে সুদুর অতীতের খবর তাকে শোনাচ্ছে। কে তৈরি করলো এই অদ্ভুত যন্ত্র? কোথা থেকে এলো এখানে? তার টেবিলের ওপর বছর চারেক এমনিই ধুলো পড়েছে। বলটু এর ওপরে না লাফালে হয়ত কেউ জানতেও পারতোনা কোনো দিন। ভাবতে ভাবতে তীব্র উত্তেজনা অনুভব করল নিতাই। রাত যত বাড়ছে উত্তেজনা তত বাড়ছে নিতাইয়ের। ইতিহাসের সাল তারিখ তেমন কিছু মনে করতে পারলো না নিতাই, যার ফলে প্রায় রাত ভোর এই স্টেশন, ওই স্টেশন ঘুরে বেড়ালো সাল তারিখ যেমন খুশি দিয়ে। ভোর রাতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে নিতাই, সেটা নিজেরই খেয়াল নেই। ঘুম ভাঙলো বেশ বেলা করে। গতকালের মত আজও তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল নিতাই। জীবনে প্রথমবারের মত আফসোস হচ্ছে তার, আরো একটু মন দিয়ে পড়াশোনা করলে, আর বাইরের খবরাখবর রাখলে এই মুহুর্তে তার সামনে কি বিশাল এক জগতের দরজা খুলে যেত! 

রতনবাবু স্যার একটু ভালো করে দেখলেন নিতাইকে। লোকটা আজ চাইছে গত আশি-নব্বই বছরের ইতিহাসে বিশেষ বিশেষ ঘটনার দিনক্ষন। কিন্তু কেন? কি দরকার? নিতাই প্রথমে আমতা আমতা করল। সে এমনিতেই স্বল্পভাষী মানুষ। তার ওপরে মিথ্যে বলার প্রয়োজন বা অভ্যেস কোনোটাই তার নেই। আবার সত্যিটা বললে রতনবাবু স্যার নির্ঘাত তাকে পাগল ঠাউরাবেন। কাজেই মোটামুটি জোড়াতালি দিয়ে নিতাই যা দাঁড় করালো, তা এরকম – ভাড়াটেদের ছেলেটি স্কুলে কিছু একটা রচনা লিখবে, তাই তার এগুলো দরকার। কোন ক্লাস জিজ্ঞেস করাতে সোজা সাপটা বলে দিলো সে জানে না, তবে মনে হয় ক্লাস সিক্স কি যেভেন হবে। রতনবাবু স্যার এবার ঘোরতর সন্দেহ করলেন নিতাইকে। রাসভারি গাম্ভীর্য্য বজায় রেখে জানালেন, তিনি স্পষ্ট কারন না জানলে এরকম কোন তথ্য দিতে পারবেন না। নিতাই করুন কাঁচুমাচু মুখে একটুক্ষন চেয়ে রইলো। তার পর ধিরে ধিরে পেছন ফিরে হাঁটতে যাবে এমন সময় রতনবাবু আবার ডাকলেন তাকে। মিনিট পাঁচেকের ভেতরে সামনের টেবিলের ওপরে রাখা একটা ছোট্ট কালো নোটবইতে কি সব লিখে নিতাইকে দিলেন। নিতাই দেখলো কিছু তারিখ আর সে গুলোর ব্যাপারে দু একটা শব্দ লেখা। ধন্যবাদ জানিয়ে নিতাই বিদায় নিলো। রতনবাবু সারাটা দিন ঘটনাটা নিয়ে ভাবলেন। বাড়ি ফিরবার সময়  মোড়ের মাথায় খবরের কাগজ আর পত্রিকার খুপরি দোকান থেকে একটা খবরের কাগজ, একটা খাতা আর একটা কলম কিনলো নিতাই। তার ট্যাঁকের জোর নিতান্তই কম। এই হারে হিসেবের বাইরে খরচ করলে দুদিনেই পকেট একদম খালি হয়ে যাবে। কিন্তু আজ মনে হলো, এই খবরের কাগজটা খুব দরকার। কেননা আরো কয়েকটা ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। 

সে দিন রাতের ভেতর নিতাই, রতনবাবু স্যারের দেওয়া গোটা দশেক ঐতিহাসিক দিনে পৌঁছে কাঁটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খবর শুনেছে। শুনেছে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের সৃষ্টির ঘোষনা, শুনেছে ১৯৪৮ সালের মহাত্মা গান্ধীর হত্যা সহ অনেক কিছু। এবং খবরের কাগজে তন্নতন্ন করে খুঁজে নিতাই বের করেছে  খান চারেক ঘটনা যার মধ্যে তিনটি খেলা এবং একটি পৌরসভা নির্বাচন যে গুলো আগামী এক সপ্তাহে ঘটবে। সবচেয়ে কাছের ঘটনা আই পি এল নামক ক্রিকেট খেলায় পরের দিনই মুখোমুখি হতে যাচ্ছে চেন্নাই ও দিল্লির দুটি দল। নিতাই খেলাধুলোর খবর রাখেনা, না হলে জানতো, এই আই পি এল ঘিরে প্রতি দিন কত হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন চলে, যার একটা বড় অংশই হয়ত আইনের নাগালের বাইরে। আপাতত কাঁটা ঘুরিয়ে ভবিষ্যতে গিয়ে এই চারটি ঘটনার ফলাফলই নিতাই জেনে এসেছে। এবং লিখেও রেখেছে। বাইরের জগৎ এবং তাতে চলতে থাকা অনবরত নানা ধরনের কর্মকান্ড নিয়ে নিতাইয়ের তেমন স্পষ্ট ধারনা নেই নিতাইয়ের। লোকজনের সঙ্গে মেলামেশাও তার খুব কম। তাই নিতাইয়ের পক্ষে পুরোটা আন্দাজ করা সম্ভব হলো না যে এরকম ভবিষ্যতের ঘটনার ফলাফল জেনে ফেলাটা কতখানি বিপজ্জনক হতে পারে যদি লোক জানাজানি হয়ে যায়। তবুও হয়ত অবচেতনে কোনো ভাবে তার মনে হলো এটা বেশী জানাজানি না হওয়াই ভালো। কিন্তু জানাজানি না হোক, একটা কানাকানি শুরু হয়ে গেল দু একটা ঘটনা কে কেন্দ্র করে।

উকিল পাড়ায় এক বাড়িতে ঠাকুরঘরের খারাপ হয়ে যাওয়া সুইচবোর্ড আর প্লাগ পয়েন্ট লাগিয়ে ফিরবার সময় কাগজের দোকানে কাগজ নিচ্ছিলো নিতাই। বেলা হয়ে যাবার পর যে কটা কাগজ পড়ে থাকে, তা আর কেউ কেনেনা বলে, নিতাই প্রায়ই একটা কাগজের দামে দু তিন খানা পেয়ে যায়। বড় জোর আরো পাঁচটা টাকা বেশী দিতে হয়। কাগজ নেবার সময় দুই ছোকরা আগামী কালকের টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে ভারতের খেলা নিয়ে আলোচনা করছিলো। নিতাইয়ের মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেল, খুব লড়াইয়ের পর ভারত একেবারে শেষে এসে খেলাটা জিততে পারবেনা। ছোকরা দুজন কিছুক্ষন গম্ভীর মুখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তাদের চেহারা থেকে ঠিক সুবিধের লোক মনে হয় না। বয়স আন্দাজে যেন বড় বেশী সেয়ানা ও পোক্ত। নিতাই আর একটাও কথা বাড়ায়নি, কিন্তু তিন চার দিন পর কাগজ কেনার সময় দেখলো সেই ছোকরা দুজন আবার দাঁড়িয়ে। দোকান থেকে বেরোতেই তারা এগিয়ে এলো। নিতাই বিপদ দেখে তাড়াতাড়ি পা চালাবার চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু হলো না।

অনেক তাপ্পি তাপ্পা দিয়ে ছোকরাদের বোঝানো হলো ল-অফ-অ্যাভারেজ, পুরোনো পরিসংখ্যান  জাতীয় ভারি ভারি শব্দ, যা সবটাই নিতাইয়ের গত মাস দুয়েকের খবরের কাগজ পড়ার ফল। ছোকরারা শুনলো কিন্তু কতটা বিশ্বাস করল বোঝা মুশকিল। আর আশঙ্কাটা সত্যি হলো নিতাইয়ের যখন পরের দিন দুপুরে ওই দুই ছোকরা আবার এসে দরজায় কড়া নাড়লো। তারা কিছুই নাকি চায় না, খালি আগামী কালকের খেলার ফলাফল কি হতে পারে সেইটা জানতে এসেছে। নিতাই সামনে মুর্তিমান বিপদ দেখে ভালো রকম ভয় পেয়েছিলো। কাজেই বানিয়ে মিথ্যে বলবে কিনা সেটা ভাবার আগেই ফলাফল বন্দুকের গুলির মত মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। ছোকরা দুজন একবার আপদামস্তক দেখে নিয়ে চলে গেল সেদিনের মত। কিন্তু দুদিন পর তারা আবার এলো। এবার সঙ্গে একটা খাম। তারা বেশী কথা বলে না। নিতাই কিছু বলার আগেই খামটা তার হাতে দিলো। আর পরের খেলার ফলাফল জেনে নিয়ে চলে গেল। নিতাই প্রথমটা বোঝেনি। তার পর খামটা খুলে দেখলো খান কয়েক ৫০০ টাকার নোট তার ভেতরে। কাগজে সে পড়েছে বটে একদিন যে এই খেলা ধুলোর ফলাফল নিয়ে বড় ধরনের চক্র জুয়া চালায় এবং তাদের প্রচুর প্রভাব। কিন্তু তারা যে শেষে তারই দরজায় এসে পড়বে এটা ভাবতে পারেনি কখনো। তার মাথায় এবার এসে ঢুকলো পাহাড়ের মত দুশ্চিন্তা আর আতঙ্ক। সে অত্যন্ত সাদামাটা লোক। জীবনে কখনো কোন ঝামেলায় থাকেনি। যেখানে দেখেছে সামান্য ঝামেলা মাথা চাড়া দিচ্ছে, নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে পালিয়ে এসেছে। আরো সঙ্কুচিত করেছে নিজের চাহিদাকে। কিন্তু একেবারে বেমক্কা বাঘের সামনে পড়ে যাওয়া। ভাড়্রাটে বউ খাবার রেখে গেছে কখন, আজ নিতাইয়ের খিদে একেবারে চলে গেছে। শুধু থেকে থেকে জল তেষ্টা পাচ্ছে। একবার ভাবলো পালায়। তার পর মনে হলো, জীবনে কখনো এই মফস্বল শহরের চৌহদ্দির বাইরে পা রাখেনি সে, এখন বাইরে পালাবেই বা কোথায়? তার ট্যাঁকের জোরই বা কতটুকু? খাবে কি? টাকা কিছু আছে বটে, কিন্তু সে টাকা ছুঁতে মন চায় না। ও টাকা সোজা পথে আয় করা টাকা নয়, হতে পারে না। দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে সন্ধ্যের দিকে আবার এলো ছেলে দুটো। সঙ্গে আরো তিন চার জন লোক। একজন লোককে নিতাই ভালোই চিনতে পারলো।

 গত ছ বছরে চেহারায় মেদ অনেক খানি বেড়েছে। গায়ের চামড়া আরো চকচকে হয়েছে, গলায় মোটা সোনার চেন। কিন্তু মুখে সেই মোলায়েম হাসি। সেই লোকটা, যে ওই রেডিও সারাতে দিয়েছিলো। নিতাইয়ের ঘরে আলাদা করে বসার কোন ব্যবস্থা নেই। একখানা টুল। তার ওপরে ঢাকা দেওয়া খাবার। দুপুরে খাওয়া হয়নি। কোথায় বসতে বলবে ভেবে না পেয়ে নিতাই হতভম্ব মুখে দাঁড়িয়ে রইলো। টিমটিমে একটা আলো জ্বলছে ঘরে। টালির চালা ঘর, আর ইঁটের গাঁথনির দেওয়াল। প্লাস্টার নেই কোথাও। শুধু মেঝেটা বাঁধানো। তাও নিয়মিত পরিস্কার হয়না বলে কালচে। এদিক ওদিক তাকিয়ে লোকটা এগিয়ে এসে তক্তপোশের ওপরেই বসল। ঘামছে খুব। পরনের সাদা ফিনফিনে পাঞ্জাবী ভিজে গায়ে লটকে আছে। লোকটাও তাকে চিনেছে, হাসতে হাসতেই জল চাইলো, পাখাটাও খুলতে বলল। নিতাই চুপ চাপ জল এগিয়ে দিলো। লোকটা ওর সঙ্গে আসা বাকিদের বাইরে দাঁড়াতে বলল। তারা বাইরে গিয়ে দরজা ভেজিয়ে দিলো।

- চিনতে পারছো নিতাই?
- আজ্ঞে , পারছি
- তোমার কাজ কারবার কেমন চলছে?
- সে আজ্ঞে বলার মত কিছু নয়, কোনক্রমে চলে যায় আর কি!
- রতন বাঁড়ুজ্যের বাড়িতে কি দরকার ছিলো তোমার?

সেরেছে, লোকটা এতসব খবর রাখে নাকি? সর্বনাশ! আর কি কি জানে? নিতাই এবারে কুল কুল করে ঘামতে আরম্ভ করেছে।

- ভেবোনা অত, খবরাখবর রাখাটাই আমার কাজ, আমি কে তা তুমি জানো?
- আজ্ঞে … ইয়ে…
- তাজ্জব, এখানে তাহলে এমন কেউও আছে যে আমাকে চেনে না। আমি শ্যাম সুন্দর মল্লিক, নাম শুনেছো? 
- ইয়ে… মানে…
- আমি মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান, আর তার ওপরে কারবারি মানুষ, ব্যাবসাপত্তর করি, পৈত্রিক ব্যাবসা ছিলো কিছু, আমার হাতে পড়ে…
- আজ্ঞে স্যার আপনাকে দেখেই মনে হয় বড় মানুষ
- তোমাকে একটা রেডিও সারাতে দিয়েছিলাম না একবার?
- ইয়ে, সেটা … হয় নি…

কান টান চুলকে যেভাবে এক নিশ্বাসে এবং অনায়াসে মিথ্যেটা বলতে পারলো নিতাই তাতে নিজেই অবাক হয়ে গেল। আর টিক সেই মুহুর্তেই মনে হলো, সে অনেক কিছুই করতে পারে, কারন মন বলছে, এ লোক তার কাছে চাইতে এসেছে কিছু। 

- সে থাক গে। পুরোনো রেডিও, ও নিয়ে আর কি হবে? কেউ শোনে না। আমি তোমার কাছে অন্য দরকারে এসেছি
- আজ্ঞে বলুন স্যার, আমি কি করতে পারি
- দেখো বাপু, আমি অল্প আর স্পষ্ট কথার মানুষ, নষ্ট করার মত সময়ও আমার হাতে নেই, তাই সোজা কাজের কথায় আসি। 
- কাজের কথা? আমি… আমি কাজ…
- দেখো নিতাই, লুকিয়ে লাভ নেই। যা যা জিজ্ঞেস করছি, সোজা কথায় তার উত্তর দাও দিকি
শ্যাম মল্লিকের গলায় মোলায়েম ভাবটা একেবারেই উধাও। ফ্রেমে আঁটা হাসিটাও আর দেখা যাচ্ছে না। বরং গলায় যথেষ্ট কঠিন ভাব। 
- আজ্ঞে স্যার লুকোনোর মত আছেটাই বা কি বলুন আমার, খুবই সামান্য লোক…
- ন্যাকা… সাধারন লোক… তোমার বিদ্যেটাতো সাধারন নয় বাপু… দিব্যি ভবিষ্যতবাণী করে চলেছো, বলি একটু ঝেড়ে কাশো দিকি… আমার সঙ্গে চালাকি করে কোন লাভ হবে না।  এ তল্লাটে আমার কথাই আইন।

চালাকি করে লাভ হবে না সে কথা নিতাই জানে। শ্যাম মল্লিককে না চিনলেও এনার কীর্তিকলাপের কিছু কিছু কথা এখানকার কুকুর বেড়ালেও জানে। এনার এক কথায় চেলা চামুন্ডারা রাত কে দিন করতে পারে। এ সময়, এই চাপের মুখে নিতাইয়ের মত নিম্নবিত্ত হেরে যাওয়া ক্ষমতাহীন মানুষের আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক, এবং প্রথম দিকে নিতাই খুবই ভয় পেয়েছিলো, কিন্তু অবিশ্বাস্য ভাবে এই মুহুর্তে তার তেমন ভয় করছে না, বরং বুঝতে পারছে এই বিপদ থেকে বেরোতে গেলে আর যাই হোক ভয় পেলে চলবে না। 

নিতাইয়ের গলি থেকে বেরিয়ে গাড়ির এসিতে বসে রুমাল দিয়ে ঘাম মুছলেন শ্যামসুন্দর মল্লিক। মধ্য বৈশাখের নিদারুন দাবদাহ। বৃষ্টির নামগন্ধ নেই। তবে নিতাইয়ের মত তেএঁটে লোক খুব কম দেখেছেন তিনি। কিছুতেই মুখ খুলবে না। সেটাই স্বাভাবিক অবশ্য। গুপ্তবিদ্যা কে আর প্রকাশ করতে চায়। শেষে গুলে আর পচাকে ডেকে কানপটিতে মেশীন ঠেকিয়ে প্রানের ভয় দেখাতে হলো। এদিকে ভয় পেয়েও  টাকার লোভ আছে যথেষ্ট, কিন্তু কত টাকায় অনেক টাকা, সেই হিসেবে কোনো ধারনাই নেই এই নিতাইয়ের। যে কটা টাকা চেয়েছে, সে তো হাতের ময়লা। তবুও ব্যাটাকে সামান্য কিছু অগ্রীম দেবেন, ওই হাজার পাঁচেক। বাকি টাকা জিনিস হাতে এসে কাজ হবার পর ভেবে দেখবেন আদৌ দেওয়া উচিত কিনা। বরং এসব কাজে সাক্ষী না রাখাই ভালো। কাজ মিটলে হাওয়া করে দেওয়া যাবে লোকটাকে। কালই একটু রাতের দিকে আবার আসবেন শ্যাম মল্লিক টাকা নিয়ে। আর নিতাই ওই টাকার বদলে তাঁর হাতে তুলে দেবে সেই আশ্চর্য্য ক্ষমতা, যার বলে ভবিষ্যতের সমস্ত ঘটনা আর ফলাফল তিনি জেনে যাবেন। তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, ক্রিকেটে বুকিদের দিয়ে জুয়ায় টাকা খাটানো, কলকাতায় রেসের মাঠের জ্যাকপট, শেয়ার বাজারে…উফফফ… নিজের ভবিষ্যত ক্ষমতার কথা ভেবে শ্যাম মল্লিকের ঘামে ভেজা চুল গুলো খাড়া হয়ে উঠলো।

একদিকে হাতে কড়কড়ে লাখ দশেক টাকা এবং শ্যাম মল্লিক নামক মূর্তিমান বিপদের হাত থেকে মুক্তি। অন্য দিকে পুরোনো জার্মান রেডিও। শ্যাম মল্লিক পাঁচ হাজার টাকা অগ্রীম দেওয়ার পর সন্ধ্যেবেলা মল্লিকের হাতে তুলে দিয়েছিলো নিতাই এক খানা কাগজ। তাতে লেখা আছে জলদপুরের জঙ্গলের ভেতরে ওংকারেশ্বর মন্দিরে যাবার নির্দেশ এবং এক বাবাজির নাম। বাবাজি কে কি বলতে হবে, এবং পাঁচখানা সোনার কয়েন নজরানা দিতে হবে, সে নির্দেশও লেখা ছিলো। ওই পাঁচখানা সোনার মোহর জোগাড় করতে নিতাইকে ঘটিবাটি বেচতে হয়েছে। বলতে বলতে নিতাইয়ের চোখে জল এসে গিয়েছিলো। মল্লিক চালাক মানুষ। চ্যালাচামুন্ডার ভরসায় থাকেননি, নিজেই সাত ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে বাংলা উড়িষ্যার সীমান্তে জলদপুরের জঙ্গলে হাজির হয়েছেন পরের দিন বিকেলে। জঙ্গলের ভেতর রাস্তা আটকানো কেননা বছরের এই সময়ে ভেতরে ঢোকার নিয়ম নেই অভয়ারণ্য বলে। তবুও এক ফরেস্ট গার্ডকে কিছু টাকা পয়সা দিয়ে, তার কাছ থেকেই চোরা পথের নির্দেশ নিয়ে গাড়ি কিছুটা দূরে রেখে পড়ন্ত বিকেলে জঙ্গলে ঢুকেছিলেন শ্যাম মল্লিক।   

******
ভোর বেলা ঘুম ভেঙ্গে গেলেও শুয়েই থাকে নিতাই, যতক্ষন না গলির উল্টোদিকের বাড়ির দেওয়াল ঘড়িতে সাতটা বাজার আওয়াজ হয়। সাতটা বাজলে বিছানা থেকে উঠে মুখ চোখ ধুয়ে রাস্তার মোড়ের দোকানে গিয়ে এক কাপ চা খেয়ে আর একটা খবরের কাগজ কিনে আবার বাড়ি ফিরে আসে। এই সকাল বেলা চা খাওয়াটি বেশ লেগেছে নিতাইয়ের। টাকা খরচ হচ্ছে হোক,হাজার পাঁচেক টাকা হাতে মজুদ। এই টুকু বিলাসিতা সে করতেই পারে। তার দৈনিক রোজনামচায় কোন পরিবর্তন নেই। খবরের কাগজ পড়তে পড়তে পুরোনো টুলখানা বের করে দরজার সামনে বসে ছোঁড়াদের ক্রিকেট খেলা দেখে। তার পর চান খাওয়া সেরে তোফা একটা ঘুম। সন্ধ্যেবেলা আর একবার পাড়ার মোড় অবধি ঘুরে আসে। তার পর খেয়ে দেয়ে খাটের তলায় একটা মর্চেপড়া পুরোনো লোহার ট্রাংক থেকে বের করে জার্মান রেডিও। ইতিহাসের পাতায় ঘুরতে থাকে নিতাই। শাখা প্রশাখা বেয়ে। ভুগোল সঙ্গী করে। ভাষায় ভর করে। রেডিও পিকিং এ ছোটোদের জন্যে বাংলা গল্পপাঠের আসর। জার্মান ডয়চা ভেলের বাংলা অনুষ্ঠান, এবং বাংলার মাধ্যমে জার্মান শেখানো, বিবিসির ইংরিজির পাঠ, খেলার ধারাবিবরণী, আকাশবাণীর অনুষ্ঠান, রেডিও মস্কো, রেডিও সিলোন। রাত যত বাড়ে নিতাইয়ের আশ্চর্য্য জগত খুলে যায় চোখের সামনে। পুরোনো খারাপ হয়ে যাওয়া অন্য একটা সেটের হেডফোন খুঁজে পেয়ে এই রেডিওয়ে লাগাবার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। সাউন্ড সিস্টেম বাবদে যা কলকব্জা তার সবটাই নিতাইয়ের পরিচিত। হেডফোন লাগিয়ে শোনার জন্যে কেউ জানতেও পারেনা নিতাইয়ের অতীত আর ভবিষ্যতে ভেসে বেড়ানো। নিতাই জানে, আগামী বিশ্বকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন কোন দেশ। কোথায় কি কি ঘটতে চলেছে, রাজনৈতিক পালাবদল, বিপর্যয়, দুর্ঘটনা সবকিছু। কটা টাকা এর কাছে আর এমন কি? এ এক আশ্চর্য্য জগতের দরজা খুলে যাওয়া তার সামনে।

****
সামনে দাঁড়ানো মলিন চেহারার কাঁচুমাচু মুখের নিতাইয়ের দিকে তাকিয়েছিলেন রতনবাবু স্যার। প্রথমে ভাষা, তার পরে ইতিহাস, আজ আবার নীতি শাস্ত্র। লোকটা বদ্ধ পাগল মনে হচ্ছে। গম্ভীর মুখে চায়ের কাপে একটা চুমুক দিলেন রতন বাঁড়ুজ্যে। তার পর ধিরে ধিরে বললেন, আত্মরক্ষার জন্যে আক্রমনকারীকে হত্যা করতে হলে সেটাকে খুন বলা যায় না।

“আকাশবাণী কলকাতা, খবর পড়ছি স্বস্তিক চৌধুরি। আজকের বিশেষ বিশেষ খবর হলো – জলদপুরের জঙ্গলে লাগা আগুন আয়ত্তে আনা সম্ভব হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারনা গত কাল সন্ধ্যেবেলা প্রাচীন ওংকারেশ্বর মন্দিরে পার্শ্ববর্তী এলাকার জঙ্গলে আগুন লেগে যায়। ঘটনাস্থল থেকে আজ একটি অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। যদিও ওংকারেশ্বরের মন্দির বহুকাল পরিত্যক্ত ও আসেপাশে কোন জনবসতি নেই। স্থানীয় প্রশাসনের ধারনা চোরা শিকারি ……” 
   

২৬টি মন্তব্য :

  1. উত্তরগুলি
    1. আরো একটা দুটো প্লট আছে মাথায়।।দেখি কবে লিখতে পারি

      মুছুন
  2. দারুণ লাগলো সোমনাথ, লিখতে থাকো তুমি, রেডিও হাতে চলে এসেছে তোমার.

    উত্তর দিনমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. রেডিও তো আছে, কিন্তু ব্যাটারি কম পড়ছে আপিসের ঠেলায় :-)

      মুছুন
  3. সেই ছোটবেলায়, পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায়, শীর্ষেন্দুর সেই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর গল্পগুলোর সাথে পরিচয়।

    প্রথমদিকে পড়তে পড়তে, যখন মনে হচ্ছিলো যে এটা নিশ্চই আজকালকার এই অদ্ভুত চাহিদার যুগের এক সহজ-সরল মানুষের জীবনযাপনের সুত্রে একটা একটা শিক্ষাকে পাঠকের সামনে রাখা, তখনই ওই রেডিওটা, মাঝরাতে চালু হয়ে, মনে করিয়ে দিলো "বনি" গল্পের সেই রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি।

    পড়তে পড়তে আরো কিছু শীর্ষেন্দুসুলভ রোমাঞ্চের স্বাদ নিতে নিতে ঘুরতে লাগলো হাওয়া।

    শেষ হল সত্যজিৎ রায়ের ছোঁয়ায়, কল্পবিজ্ঞানের অসাধারণ রোমহর্ষতায়।

    দুজন বরেণ্য লেখকের এরকম আইডিয়াকে মিলিয়ে যে এরকম একটা অসাধারণ নিজস্বতাপূর্ণ লেখা হতে পারে, জানা ছিলো না।

    মানসচক্ষে দেখতাম পাচ্ছি, দুজনেরই ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসি, হাতে তোমার লেখা।

    উত্তর দিনমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. মানে ভাবছি কি ভাবে প্রতিক্রিয়াটা জানাবো। একে শীর্ষেন্দু তার ওপরে মানিকবাবু ওরে আমাকে তোরা ধর, পড়ে যেতে পারি। আসলে ২রা মে তে সকলে প্রচুর মানিকবন্দনা করছিলো। ভাবলাম কি ভাবে করা যায়। শেষে ভাবলাম লিখি। আর নিতাইয়ের চরিত্রটা লিখতে গিয়ে দেখলাম এ চরিত্র বর্ণনার সেরা লোক শীর্ষেন্দু। এই আর কি। শেষে এল ডোরাডো তো থাকবেই। ওইটিই তো বন্দনা।

      মুছুন
  4. একেবারে যাকে বলে আনপুটডাউনেবল। এই গোত্রের গল্পের একটা বই হোক এবারে। অবশ্যই অলঙ্করণ সহ।

    উত্তর দিনমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. এই আপনার থেকে কমপ্লিমেন্ট পেলে না, মনে হয় - "আজ কাল পাওঁ জমিন পর নেহি পড়তে হ্যায়"

      মুছুন
  5. ছোটবেলার সংকর্ষণ রায়ের কল্পকাহিনীর কথা মনে পড়ে গেলো। চালিয়ে যাও ভায়া, আর এই দাদা কে স্বাদগ্রহন থেকে বঞ্চিত কোরো না 🙏🙏🙏🙏।

    উত্তর দিনমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. একদম। আপনার ক্রমগত উৎসাহ ছাড়া কিন্তু সতোপন্ত নামতো না। আর সেটা না নামলে এ লেখাও বেরোতো না।

      মুছুন
  6. লকডাউন টা,ভ্যাগিস এসেছে। অন্য সূত্রে জেনে ছিলাম মেয়ে জার্মান টুকটাক শিখছে, কিন্তু তার থেকে একটা এত সুন্দর গল্প। অলস নিতাই সময় কে নিয়ে খেলছে

    উত্তর দিনমুছুন
  7. সিনেমা দেখলাম...পুরো পুরো টান টান একটা টেলিফিল্ম...মুখ্য ভূমিকায় চন্দন সেন...কাহিনী ...চিত্রনাট্য...পরিচালনায় বলাই বাহুল্য...

    উত্তর দিনমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. এই চন্দন সেনকে কিন্তু দিব্য মানাবে। ঠিক কয়েছ

      মুছুন
  8. উত্তরগুলি
    1. অনেক ধন্যবাদ। এই মন্তব্য গুলো পাবার লোভেই অনেক কাজ সামলেও একটু সময় লেখার জন্যে বাঁচিয়েই রাখি।

      মুছুন
  9. সোমনাথ । এক কথায় অসাধরণ 👍👍👍। অদ্ভুত ভালো লাগলো , অদ্ভুত ভালো 👍😊। পুরো চোখের সামনে দেখলাম যেনো সিন বাই সিন

    উত্তর দিনমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. এরকম মন্তব্য পেলে মনে হয় লেখার খাটুনিটা সার্থক 😊

      মুছুন
  10. উত্তরগুলি
    1. নিশ্চই।।আসলে একটা গপ্প ৮০% লেখার পর আমার নিজের ল্যাপটপটি বিগড়েছেন। এবং তাঁর স্মৃতিভ্রংশ ঘটেছে। কাজেই পুরোনো লেখাটি গেছে। নতুন করে লিখতে হবে।

      মুছুন
  11. ছোটবেলায় আনন্দমেলা হাতে পাবার জন্য মুখিয়ে থাকতাম ঠিক এই কারণে । স্কুলে অফপিরিওডে বসে গুজগুজ ফুসফুস চলত এসব নিয়েই । অনেক নক্সাও এঁকে দেখাতিস। আজ সে সব অতীত বাস্তব শুধু এই গল্পটুকু।

    উত্তর দিনমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. হি হি। মনে আছে? আমাদের সেই সব উদ্ভট মডেল তৈরি। তুই একটা সোলার পাওয়ার কুকার করেছিলি। জল গরম ও হতো সেটায়।

      মুছুন