মঙ্গলবার, ৬ জুন, ২০১৭

পত্রলেখার লেখা

বিষন্ন সন্ধ্যের মুখ। শহরতলীর কিঞ্চিত হাত পা ছড়ানো সুখী গৃহকোন। আজ তার ১৩ বছরের জন্মদিন। 
-  এটা কি?
-  খুলেই দেখ 
-  বাবা… তুমি এটা কি দিলে আমাকে জন্মদিনে?
-  খুব ভাল বই রে মা, পড়িস একটু , সত্যি ভাল লাগবে 
-  তুমি খুব ভাল করে জানো আমি বই পড়িনা, আমার এসব ভাল লাগে না বাবা
-  কিন্তু … তুই 
-  তোমাদের সেই এক বই, এক গল্প, এক কথা, তোমরা আমাদের জেনারেশনটা বুঝছো না, আমাদের এসব আর চাই না, আমাদের এন্টারটেইনমেন্ট চাই, এক্সাইটমেন্ট চাই 
-  এই বইটাও কিন্তু খুবই এক্সাইটিং … মানে “চাঁদের পা…”
-  বুলশীট বাবা, জাস্ট গেট লস্ট ……আমার বার্থডে টা স্পয়েল করলে… তুমি… তুমি
-  আচ্ছা মা, আমি বইটা ফেরত নিচ্ছি…
-  আমার গিফট? কিছু দেবে না? 
-  এই নাও, কিছু টাকা দিলাম তোমাকে , কিছু কিনে নিও, তোমার যা পছন্দ হয়
-  বাবা তুমি কষ্ট পেলে? 
-  না রে মা, তুই আনন্দ পেলেই আমার আনন্দ
*********
টেলিফোনের আওয়াজের আশায় বসে থাকা। পড়াশোনার চাপে মেয়ে বাড়ি থেকে বহু দূরে। ওর মত মেধাবী ছাত্রীকে আরো অনেক অনেক দূর যেতে হবে। এর পর দেশের বাইরে, দশের এক জন হতে হবে। এই ২৩ বছরেই তার মেধার ঝলকে চোখ ঝলসে যায়।
-  ফোন করিসনা কেন মা?
-  বাবা, তুমি জান আমি কতটা ব্যাস্ত, ফাইনাল সেমেস্টার আমার, ডু ইয়ু আন্ডারস্ট্যান্ড বাবা? তোমাদের না হয় এসব করতে হয়নি
-  না না মা, তুমি এসব নিয়ে ভেবোনা, আমরা ভাল আছি, তুমি ভাল থেকো, তুমি পড়াশোনা করো। 
-  আমার হোয়াট অ্যাপ গুলো দেখে কিছু লেখো না কেন? 
-  আমি যে ইংরিজি অক্ষরে বাংলা টাইপ করতে পারিনা মা, আর তুমি বাংলা তেমন পড়তে পারো না... তাই ফোনে ......
-  বাবা......... কাম অন ...... দুনিয়া কোথা থেকে কোথায় চলে গেল, আর তুমি !!!
-  তুই ভাল আছিস তো মা?  
-  আমি ভালোই আছি বাবা, চলো রাখলাম। 
-  ভাল থাকিস মা
-  আর হ্যাঁ, মা বলছিল রাত জেগে কি সব লেখালিখি করো, এসব এবার কমাও। খাও দাও ঘুম দাও 
-  সাবধানে থাকিস 
-  আমার কথা পছন্দ হলোনা বুঝি? 
-  না না, শুয়ে পড়ব এবার। 
-  গুড নাইট বাবা
*********
ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে গাড়িটা। লোকটা চিরকাল মিসটেক করেই গেল। ৩৩ বছরের বার্থ ডে ছিল গতকাল, বস্টনে কত আনন্দ করা হবে বলে এক মাস আগে থেকে পার্টির প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, আর ঠিক সেই দিনেই বাবা চলে গেল। না এসে পারা যায় না, কিন্তু হাফ-আ-ওয়ার্ল্ড পাক দিয়ে এভাবে কি আসা পসিবল? তার ওপরে সিলি সব নিয়ম কানুন। তবু ভাল, মেয়েদের নাকি তিন দিনেই সব মিটে যায়। মায়ের বেলাতেও দেখেছিল বছর চারেক আগে।
-  হাউ ফার দিনুকাকা? ফিলিং ক্লস্ট্রোফোবিক এই বিশ্রি গাড়িটার মধ্যে
-  কষ্ট? কি বললি ওটা?
-  ছাড়ো। আর কতদুর?
-  এসেই গেছি, ওই যে চেতলার ব্রিজ দেখা যাচ্ছে। তুই একটু বিশ্রাম নিয়ে এলে পারতিস, আর ঘন্টা খানেক...
-  না গো, যা হবার হয়ে যাক, আমাকে তিন দিনের মাথায় রিটার্ন ব্যাক করতে হবে।
-  চলে যাবি? আর বাড়ি ঘর?
-  তোমরা আছো দিনু কাকা, দেখবে
-  আমরাও আর কদ্দিন বল? তোর বাবা আমার থেকে দু বছরের ছোটো ... সেই কত ছোটো বেলা থেকে
-  আঃ থাক না দিনু কাকা, আই ডোন্ট লাইক দিজ...
-  আচ্ছা থাক......এটা রেখে দে ...
-  জিজ্‌ ... এটা কি? 
-  তোর বাবা্র খাতা 
-  হোয়াট? আমি কি করব? 
-  পড়বি
-  আমি? আর য়্যূ ক্রেজি দিনু কাকা? দিস ইজ বাংলা... আমি তো বাংলা তেমন করে...
*********
ক্লান্ত, বড় ক্লান্ত লাগে আজকাল। বড্ড একা লাগে। সারা দিনের কাজের শেষে বাড়ি ফিরতেও ইচ্ছে করেনা। খালি ঘরগুলো মনে হয় গিলতে আসছে। ছোটোবেলায় একা একা ভয় করলে বাবাকে ডাকলেই হয়ে যেত। এখন বাবা কতদুরে ? কে জানে? কি সব গল্প বলত বাবা! মনেও পড়েনা। আজ তেতাল্লিস বছরের জন্মদিন। অফিসের দু একজনের উইশ, কয়েকটা ইলেক্ট্রনিক মেসেজ ছাড়া আর কিছু নেই। ব্যাঙ্কে জমে থাকা লাখ লাখ ডলার একাকিত্ব ঘোচাতে পারেনা। খুব অভিমান হচ্ছে বাবার ওপর। কেন চলে গেল লোকটা? এই আধবুড়ি হয়ে গেলেও কেন কান্না পায় একা থাকতে ? 
-  কেন চলে গেলে বাবা?
-  ...
-  বাবা... তুমি আমাকে গল্প শোনাবে? আজ আমার জন্মদিন। তোমার সেই বিচ্ছিরি বই গুলো দেবে আমাকে? 
-  ......
-  বাবা? তুমি কেন নেই? 
-  .........
-  তোমার কিছুই নেই আমার কাছে, কিচ্ছুটি না বাবা...... শুধু তুমি মারা যাবার দিনে দিনুকাকা একটা নোংরা কাপড়ে জড়ানো কতগুলো খাতা দিয়েছিল,সেই গুলো আছে।
-  .........
-  আমি তো বাংলা পড়তে পারিনা ভাল বাবা, কি করে পড়ি অত লেখা? তুমি যা লিখে রেখেছ? খাতার ওপরে আমার নামই লিখে রেখেছ – পত্রলেখার জন্য। কিন্তু... আমি...... বাবা...... কেন চলে গেলে এই দিনটায়? 
-  ............
*********
এত ধুলো বালি, তার ওপরে এত লোক, মাঝে মাঝে দিশাহারা লাগে, তাও ভালও লাগে। তবে বইমেলার এত আওয়াজ - মাইক্রোফোন, কলরব, এটায় এখনো অসুবিধে হয়। এই নিয়ে তৃতীয় বার কলকাতা আসা হলো বইমেলায়। তৃতীয় বইয়ের প্রকাশ হয়ে গেল আজ। আজ তিপ্পানতম জন্মদিন, আজ বাবার চলে যাবার কুড়ি বছর পূর্তী।   
-  ম্যাডাম, পুরস্কারের সময় তো কলকাতা আসতে পারেননি, কিন্তু আজ তৃতীয় বই প্রকাশ হওয়াতে কেমন লাগছে?
-  ভাল লাগছে, আরো ভাল লাগছে, ছোটোরা আমার বই পড়ছে দেখে।
-  ম্যাডাম ...
-  ম্যাডাম ম্যাডাম করছ কেন ভাই? পত্রলেখাদি বলতে পারো, শুধু দিদিও বলতে পারো, ম্যাডাম বললে কেমন যেন...
-  দিদি আপনার বাংলা এত সহজ সরল, এত আমুদে... এই ভাষা আপনি রপ্ত করলেন কি করে? কবে থেকে লেখা আরম্ভ করলেন দিদি?
-  ওরে বাবা, সহজ কি কঠিন অত আমি জানিনা। আমি শুধু গপ্প বলার চেষ্টা করি। ওই আমার বাবা যেমন করে গল্প বলত, তেমন করে।
-  আপনার লেখার ভক্ত তো শুধু ছোটোরা নয় দিদি, বড়রাও, এই আমিই একজন ভক্ত আপনার।
-  আমার কিন্তু একটু লজ্জা করছে ভাই, আমি এত সব প্রশংসায় একেবারেই......
-  আপনার লেখার ব্যাপারে গুরু কে?
-  আমার বাবা
-  কত বছর বয়স থেকে শুরু করেন ?
-  বেশীদিন না, সবে এই ধরো বছর সাত আট হলো লেখালিখি শুরু করেছি
-  আপনার বাবা এখন কি...
-  উনি নেই। আজ ওনার মৃত্যুদিন। কুড়ি বছর হল...
-  তাহলে...... মানে......
-  আমি বাংলা পড়তেই পারতাম না ভাল করে। বাবা চলে গেল, কয়েকটা খাতার বান্ডিল রেখে গেল আমার জন্যে। পাতার পর পাতা লেখা। যে কথা , যে গল্প আমাকে বলতে পারেনি, সেই সব লেখা। পাছে আমার পড়তে অসুবিধে হয়, তাই খুব সহজ করে, আবার সাহিত্যমূল্য অক্ষুন্ন রেখে, যাতে বাংলা ভাষাকে চিনতে শিখি।। আর সেখান থেকেই আমার শেখা শুরু...
-  আর ওনার লেখা গুলো
-  আমি খুব হিংসুটি মেয়ে ভাই। আমার বাবার লেখা গুলো শুধু আমার, আমিই পড়ব। 

কোন মন্তব্য নেই :

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন